পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। মাওলানা উবায়েদুর রহমান খান নদভী।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। মাওলানা উবায়েদুর রহমান খান নদভী।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। মাওলানা উবায়েদুর রহমান খান নদভী।

 

 

পাকিস্তানের রাজনীতি বাইরের লোক দূরে থাক ভেতরের লোকেরাও তেমন একটা বোঝে না। যারা বোঝে তারা জানে কেরামতিটা কোথায়। পাকিস্তানের রাজনীতিতে নানা লোকের লোভের প্রভাব আছে বটে, কিন্তু সেখানে দেশ বিক্রির ব্যাপারটা সঠিক নয় এবং আমেরিকা বা চীনের নিয়ন্ত্রণে সব হয় ভাবাটা ঠিকও নয়।

ইমরান খান সরকারকে ঘিরে আমার কথা এটাই। ইমরানরা যে বলার চেষ্টা করছে আমেরিকা তার সরকার হটাতে চায়, তাই বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনছে এটি সত্য নয়।

সত্য হলো, ইমরানের প্রতি আমেরিকা বিরক্ত এটি সত্য হলেও রেজিম উল্টে দেওয়ার সামর্থ্য আমেরিকার নাই, কিন্তু রেজিম উল্টে গেলে নিজের যে দাপট আছে তা দৃশ্যমান হয় দেখতে আমেরিকার ভাল্লাগে, মানে তারা পরিস্থিতি উপভোগ করে।

মূলতঃ ইমরানকে ঘিরে পক্ষ দুইটা। বিরোধী দল ও সেনাপ্রধান। ইমরানকে সরাতে চায় মূলতঃ নওয়াজ শরীফ। এক্ষেত্রে তাকে মূল সহযোগিতা করছেন মাওলানা ফজলুর রহমান। উভয়ের ক্ষোভ অত্যন্ত স্পষ্ট। নওয়াজকে সরিয়ে তৃতীয় সারির দল তেহরিকে ইনসাফকে ক্ষমতায় আনছে আর্মি। এখন ইমরানকে সরাতে পারলে আর্মির লগে টেক্কায় নওয়াজ জিততে পারবেন।

এখন কথা হলো মাওলানা ফজলুর রহমানের ক্ষোভ কোথায়। এক্ষেত্রে সবাইকে মনে করিয়ে দেই, ইমরান ক্ষমতায় আসার পরপরই তাকে উৎখাতের ডাক দিছিলেন এই মাওলানা। এর কারণকে ইমরানসহ অনেক ইতরই দুর্নীতির বিচার বলে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু ক্ষোভটা আসলে রাজনৈতিক। এক্ষেত্রে মনে করিয়ে দেই মাওলানা ফজলু পাকিস্তানের ইসলামী দলগুলোর জোট করে এক সময় ৭২টা আসন পাইছিলেন এবং প্রাদেশিক ক্ষমতায়ও ছিল তার জোট। ইমরান যে ক্ষমতায় আসল, তাতে মূলতঃ ইসলামী জোটের আসনগুলোকেই হরেদরে ছিনিয়ে নিয়েছে আর্মি। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী মাত্র একটি আসন পেয়েছে। ইতর লোকেরা তাদের ভেতরকার কুৎসিত বিদ্বেষ থেকে এসব নির্বাচনী ফলাফলকে ইসলামী দলগুলোর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া টাইপের মিথ্যা বিশ্লেষণে আড়াল করে। কিন্তু পাকিস্তানের ডিপ স্টেটকে যারা জানে তারা ভালোমতোই বোঝে যে আসলে ম্যাকানিজম করে ইসলামী দলগুলোকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখা হয়। এই দূরে রাখা যুগ যুগ ধরে ইসলামী দলগুলো মুখ বুঝে মেনে নেয়। কিন্তু মাওলানা ফজলুর রহমান শেষ পর্যন্ত ত্যক্তবিরক্ত হয়ে প্রচণ্ড ক্ষেপেছেন ইমরানকে ক্ষমতায় আনার ঘটনায়। পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় নেতা নওয়াজের কোনঠাসা দশার কারণে তার থেকে প্রশ্নাতীত সমর্থন পেয়ে মাওলানা ফজলু তার রাজনৈতিক ক্ষমতা তথা প্রকৃত বিপুল জনসমর্থন দিয়ে ক্ষমতার আসার অল্প দিনের মধ্যেই ইমরানকে হটাতে মাঠে নামেন। এটি পাকিস্তানের ইসলামী রাজনীতির জন্য জরুরিও ছিল৷ কারণ আর্মি পাকিস্তানের তরুণ ইসলামপন্থীদের, বিশেষ জামায়াত ঘরানার জমিয়তে তালাবার নেতাদের ইমরানের দলে ভিড়িয়ে মডারেট ইসলামের এক ক্ষমতার উত্থান ঘটিয়েছে যার ফলে ইসলামী রাজনীতিকে খোদ ইসলামপন্থী তরুণরাই পশ্চাদপদসহ নানা গালিগালাজ করে। বাংলাদেশেও ইমরান খান সমর্থকরা এই কাজ করে, তারা মাওলানা ফজলুর রহমানকে জঘন্যভাবে গালি দিয়েছে। কিন্তু মাওলানার রাজনীতি ফেসবুক নির্ভর নয়, তরুণদের সমর্থন নির্ভর নয়, পাকিস্তানের সমাজ কাঠামোতেই ইসলামী দলগুলোর বস্তুগত অনেক ক্ষমতা আছে, মানে তাদের আছে স্ট্রিট পাওয়ার, সম্পদ ও প্রভাব। ফলে আর্মি যত ম্যাকানিজম করুক না কেন বুদ্ধি খাটাতে পারলে তারা বারবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। মাওলানা ফজলুর রহমান মূলতঃ এ কাজই করছেন। তিনি নওয়াজ শরীফ ও বেনজির ভুট্টোর দলকে কাছে টেনে ইমরানকে উৎখাত করছেন।

এক্ষেত্রে তার সফল হওয়ার সুযোগটি শুরুতে কম ছিল, কারণ তখন আর্মি তাকে পুরোপুরি ইমরানের পক্ষে ছিল। আর ইমরানের বড় সুবিধা ছিল ইসরায়েলকে স্বীকৃতি ইস্যুতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাকে হাত করেছিল। কথা ছিল ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় আসলে সৌদি আরব সমর্থন দিলে পাকিস্তানও সমর্থন দেবে। অনেক আহাম্মকভাবে যে ইমরান ইসরায়েল বিরোধী। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো যখনই কেউ বলবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিলে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে তখন বুঝবেন যে এ লোক আসলে ইসরায়েলের দালাল। মূলতঃ আসল পজিশন হলো ইসরায়েল চিরকাল অবৈধ রাষ্ট্র, একে কোনো কন্ডিশনে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলাটাই হলো দালালি। সৌদির পাশাপাশি ইমরান খানরা এই দালালিতে লিপ্ত। যাই হোক, ইসরায়েলি দালাল ইমরানের কপাল পোড়ে মূলতঃ আমেরিকায় জো বাইডেনের ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়ে। ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে গেছে। ফলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান ছাড়া বাকিদের যে হাসফাঁস অবস্থা ছিল তাও শিথিল হয়।

এরমধ্যে মজার ঘটনা হলো, ইমরান টানা ক্ষমতায় থাকার মতলবে আর্মির মধ্যেও নিজস্ব বলয় তৈরি করেন, সেক্ষেত্র বর্তমান সেনাপ্রধানকে ডিঙ্গিয়ে পরবর্তী সম্ভাব্য সেনাপ্রধান হিসাবে আইএসআই চিফ জেনারেল ফয়েজ হামিদকে লাইমলাইটে আনতে ইমরাম তার মতলবি তৎপরতা শুরু করে। এর শোডাউন ছিল আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতা পুনর্দখল করলে সেখানে ফয়েজকে পাঠানো। এর মাধ্যমে সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়া যা বোঝার বুঝে যান। তাৎক্ষণিকভাবেই আইএসআই চিফকে বদলি করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে না জানিয়েই নাদিম আহমেদ আনজুমকে নতুন আইএসআই চিফ নিয়োগ দেন, এ নিয়োগ অনুমোদন করতে ইমরান গড়িমসি করেও পরে তা মানতে বাধ্য হন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও আর্মি চিফের বিরোধকে লুফে নিতে বিলম্ব করেননি নওয়াজ-মাওলানা-জারদারির বিরোধী জোট। তারা আর্মি চিফের সঙ্গে দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেলতে সক্ষম হন। ফলে ইমরানের নিজ দলের মন্ত্রী ও সিনেট সদস্যদের একটি গ্রুপ এবং জোটের শরিক দলকেও হাত করে ফেলে বিরোধী জোট।

এখন খেয়াল করেন, পুরো খেলায় আর্মি চিফ ও বিরোধী জোট ভাবটা করছে কী, যেন ইউক্রেন অভিযানের মধ্যে ইমরানের রাশিয়া সফরের কারণে তার সরকারকে হটিয়ে দিচ্ছে। ইমরানও চালাকি করে এই কথাটাই বলতে চেয়েছে যে আমেরিকার এক কর্মকর্তা তার সরকার উৎখাতের হুমকি দিছিল। অথচ ডিপ্লোমেসির লোকেরা জানে যে বৈঠাকাদিতে আরও অনেক বাজে কথাই বলা হয় এবং তা ধর্তব্য হয় না। আমেরিকার কেউ বললে কোনো দেশে সরকার পড়ে যায় না, তাহলে বাংলাদেশে হাসিনা সরকার বহু আগেই যাইত। হিলারি চাওয়ার পরেও হাসিনা সরকার ইহুদি লবি ধরে ক্ষমতায় আছে। তেমনি ইমরানকেও ইহুদি লবি টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট না হওয়ার কারণ নাই। কিন্তু পরিস্থিতির সুযোগটা আর্মি চিফ ও বিরোধী জোট এমনভাবে নিচ্ছে যে কারো চেষ্টাতেই ইমরান টিকছে না। কারণ পাকিস্তানের সব প্রভাবশালী মহলই তাকে উৎখাত করতে চাচ্ছে। এটির আসলে কেমন তা বুঝতে পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রিকা ডনের ভূমিকা দেখুন। তারা ইমরানের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই শক্ত অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে ইমরান যখন সংসদ ভেঙে দেওয়ার চালাকি করল, তখন ডন কিভাবে এর বিরোধিতা করছে খেয়াল করুন। ডন মানেতো পাকিস্তানের এলিট নাগরিক সমাজ। বাংলাদেশের জায়গা থেকে দেখুন, হাসিনা যখনই চ্যালেঞ্জের শিকার হয়েছে ডেইলি স্টার, প্রথম আলো তথা নাগরিক সমাজ তাকে সমর্থন করেছে।

পাকিস্তানীদের রাজনৈতিক চরিত্র হলো তারা পরিস্থিতির সুযোগ নিতে গিয়ে যখন যা দরকার তা করে, কিন্তু তাদের একটা নিজস্ব অবস্থানও আছে।